একে একে সামনে আসছে ঘাতক সোহেলের সব অপকর্ম

 

রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছর বয়সি শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার প্রধান আসামি সোহেল রানার অন্ধকার অতীত ও দীর্ঘদিনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের চিত্র জনসমক্ষে আসতে শুরু করেছে।

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার প্রধান আসামি সোহেল রানা। ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার প্রধান আসামি সোহেল রানা। ছবি: সংগৃহীত


নাটোরের মহেশচন্দ্রপুর গ্রাম থেকে শুরু করে ঢাকার পল্লবী সোহেলের বিচরণ যেখানেই ছিল, সেখানেই সে রেখে গেছে অপরাধ আর নৈতিক অবক্ষয়ের ছাপ।

 
সোহেল রানার আদি বাড়ি নাটোরের মহেশচন্দ্রপুরে। সেখানে সে দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিল। তার আপন ছোট বোন জলি বেগম অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘চার বছর আগে সোহেল বৃদ্ধ মা-বাবা এবং পরিবারকে ছেড়ে চলে যায়। আমরা তার কোনো পরিচয় দিতে চাই না এবং ভবিষ্যতে তার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতেও আগ্রহী নই। সে যে জঘন্য অপরাধ করেছে, তার যেন সর্বোচ্চ শাস্তি হয়।’
 
সোহেলের মা-ও একই আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, গত চার বছর ধরে সোহেল তার পরিবার বা সন্তানদের কোনো খবর নেয় না এবং কোনো প্রকার আর্থিক সহযোগিতাও করে না।
 
গ্রামের বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, সোহেল এলাকায় একজন পেশাদার চোর হিসেবে পরিচিত ছিল। সে সরকারি রড চুরিসহ স্থানীয় অটো-মিলের রড চুরির অপরাধেও একাধিকবার ধরা পড়ে মারধর খেয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে বারবার সে ছাড় পেয়ে যেত।
 
 
সোহেলের পারিবারিক জীবনও ছিল কলঙ্কিত। ১০ বছর আগে সে প্রথম বিয়ে করেছিল এবং সেই ঘরে তার একটি সন্তান রয়েছে। তবে আপন ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ার কারণে তার সেই সংসার ভেঙে যায়। তিন বছর আগে সে দ্বিতীয় বিয়ে করলেও তার স্বভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সে অনলাইন জুয়া ও বিভিন্ন নেশায় আসক্ত হয়ে বিপুল পরিমাণ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং পাওনাদারদের চাপে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।
 
এলাকা ছেড়ে ঢাকায় এসে মিরপুরের পল্লবী এলাকায় রিকশা মেরামতের কাজ শুরু করে সোহেল। তবে তার মাদকাসক্তি ও উচ্ছৃঙ্খল জীবন সেখানেও অব্যাহত ছিল। পল্লবীর বিহারি ক্যাম্পের একটি বাসায় সাবলেট হিসেবে থাকার সময় নিয়মিত ইয়াবা সেবনের অপরাধে তাকে সেই বাসা থেকে বের করে দেয়া হয়।
 
পরবর্তীতে পরিচিতদের মাধ্যমে পল্লবীর একটি গ্যারেজে কাজ নিলেও কাজে অনিয়মিত হওয়ার কারণে সেখান থেকেও তাকে ছাঁটাই করা হয়। সবশেষ জনৈক মাসুদের বাসায় সাবলেট হিসেবে ওঠার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় সে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করে।
 
সোহেলের এই পৈশাচিক কর্মকাণ্ডে মহেশচন্দ্রপুর গ্রামের সাধারণ মানুষ লজ্জিত ও মর্মাহত। স্থানীয়রা তাকে ‘পশু সমতুল্য নেশাখোর’ আখ্যা দিয়ে বলছেন, সোহেলের মতো এক কলঙ্কিত ব্যক্তির জন্য পুরো গ্রামের দুর্নাম ছড়িয়ে পড়ছে। গ্রামবাসী ও পরিবারের সদস্যরা ঐক্যবদ্ধভাবে এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং খুনি সোহেলের ফাঁসি দাবি করেছেন।
 
 
শিশু রামিসা হত্যার পর পালিয়ে গেলেও পুলিশ তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় ৭ ঘণ্টার সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে হয়। বর্তমানে সে পুলিশি হেফাজতে রয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান।
 
গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে মিরপুরের পল্লবীর একটি ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং পরে বাথরুম থেকে খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা হয়।
 
প্রথমে প্রধান আসামি সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটক করা হয়। পরে সোহেলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে সোহেল রানা।

Post a Comment

Previous Post Next Post