সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধির সুপারিশ



সর্বনিম্ন বেতন দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধির সুপারিশ করে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম পে-স্কেল (নবম বেতন কাঠামো) প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের কাছে জমা দিয়েছে বেতন কমিশন। গতকাল বুধবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশমালা আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন বেতন কমিশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান। সরকারি চাকরিতে বৈষম্য কমাতে প্রতিবেদনে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১:৮ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।


কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, নতুন এ বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সরকারের বার্ষিক অতিরিক্ত প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। প্রস্তাবিত কাঠামোতে সর্বোচ্চ বেতন বর্তমানের ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, সর্বনিম্ন মূল বেতন বর্তমানের ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এতে সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারী সবমিলিয়ে যেখানে ১৬ হাজার ১৫০ টাকা পান, নতুন স্কেল কার্যকর হলে তিনি পাবেন ৪১ হাজার ৯০৮ টাকা।


প্রতিবেদনে নিচের দিকের গ্রেডভুক্ত (২০তম থেকে নবম) কর্মচারীদের জন্য বাড়ি ভাড়া আনুপাতিক হারে বাড়ানোর এবং ওপরের দিকের গ্রেডগুলোতে (প্রথম থেকে অষ্টম) বাড়ি ভাড়া কিছুটা কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ নতুন বেতন কাঠামোর ফলে সরকারি ১৫ লাখ স্থায়ী কর্মচারীসহ সামরিক বাহিনী ও শিক্ষক মিলিয়ে প্রায় ২৪ লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন।


অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রস্তাবিত এ বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের রূপরেখা সম্পর্কে জানান, সরকার দুই ধাপে এটা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করবে। ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে আংশিক কার্যকর হতে পারে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন স্কেল পুরোপুরি কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।


উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন, কমিশনের এই প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর আরও কয়েকটি পর্যালোচনা কমিটি এটি যাচাই-বাছাই করবে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগতে পারে। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই প্রতিবেদন জমা দেওয়াকেই একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে।


এদিকে, প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে, বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিজীবী, খেটে খাওয়া মানুষ বাজারে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে চিন্তিত। একটি ট্যুরিজম কোম্পানিতে চাকরি করেন মো. ইউনূস। তিনি কালবেলাকে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেও আমাদের বেতন বাড়বে না। কিন্তু নতুন বেতন বৃদ্ধির প্রভাব ঠিকই বাজারে পড়বে। আমরা কীভাবে বেঁচে থাকব—সেটাই চিন্তা করছি।


রাজধানীর নীলক্ষেত মোড়ে এই প্রতিবেদকের কথা হয় রিকশাচালক আলী হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাজারের অবস্থা দেখব। না কুলাতে পারলে পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দেব। আমাদের কথা সরকার বা কেউ ভাবে না।


ঢাকার একটি বাড়ির নিরাপত্তা কর্মী মো. নাঈম জানান, তিনি মাসে ১০ হাজার টাকা বেতন পান। তিনি বলেন, বর্তমানে এ টাকা দিয়েই চলতে পারছি না। জিনিসপত্রের দাম বাড়লে চলব কীভাবে?


নারী উদ্যোক্তা ও সিডব্লিউসিসিআইর সভাপতি মনিরা আক্তার কালবেলাকে বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন যৌক্তিক আকারে বাড়বে, তাতে কোনো সমস্যা নেই। একই সঙ্গে বেসরকারি চাকরিজীবী এবং খেটে খাওয়া মানুষের বিষয়টি সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। বেতন বাড়লে দাম বাড়ে—এটা অতীতে দেখা গেছে। সেটা থেকে সরকার কীভাবে বের হয়ে—সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Post a Comment

Previous Post Next Post